পুরান ঢাকার মালিটোলাতেই তৈরি হচ্ছে প্যান্টিন, ডাভ, হেড অ্যান্ড শোল্ডার, সানসিল্ক ও ক্লিয়ার শ্যাম্পু !

0
2
পুরান ঢাকার মালিটোলাতেই তৈরি হচ্ছে প্যান্টিন, ডাভ, হেড অ্যান্ড শোল্ডার, সানসিল্ক ও ক্লিয়ার শ্যাম্পু 

পুরান ঢাকার মালিটোলাতেই তৈরি হচ্ছে প্যান্টিন, ডাভ, হেড অ্যান্ড শোল্ডার, সানসিল্ক ও ক্লিয়ার শ্যাম্পু 

ত্বক ফর্সাকারী’ বিভিন্ন প্রসাধনী সামগ্রীর চটকদার বিজ্ঞাপনে বিভ্রান্ত হচ্ছেন বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষ। ‘সৌন্দর্য বর্ধনকারী’ এসব প্রসাধনী সামগ্রী কোনো রকম যাচাই না করেই চোখ বন্ধ করে কিনছেন তারা। ব্যবহারও করছেন সকাল-সন্ধ্যা। কিন্তু ব্যবহারকারীরা কি জানেন, তারা প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছেন প্রসাধনী কোম্পানি দ্বারা। তার উপর রয়েছে আসল কোম্পানির কৌটা, মোড়ক ও বোতল ব্যবহার করে নকল প্রসাধনী উত্পাদন। এগুলো ব্যবহারে ত্বকের কোনো প্রকার উপকারতো হয়ই না উল্টো শরীরে নিয়ে আসে জটিল রোগ। ক্রমাগত এসব প্রসাধনীর ব্যবহার কিডনি জটিলতা, চর্মরোগ, ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, হূদযন্ত্রে সমস্যাসহ দৃষ্টিশক্তি হরাস করে। গর্ভবতী নারীদের পেটের সন্তানও বিকলাঙ্গ হতে পারে এসব প্রসাধনী ব্যবহারে। বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা জানান, চিকিত্সা বিজ্ঞানে এমন কোনো ওষুধ আবিষ্কার হয়নি যা মানুষের ত্বক ফর্সা করে।

দেশ-বিদেশের নামি-দামি কিছু কোম্পানির প্রসাধনী হুবহু নকল করে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী বাজারে ছাড়ছে। বিদেশি প্রসাধনী ব্যবহারের পর খালি বোতল বা কন্টেইনার তারা সংগ্রহ করে। ওই সব খালি বোতল বা কন্টেইনারে জনস্বাস্থ্যের ক্ষতিকর মার্কারিসহ (পারদ) বিভিন্ন বিষাক্ত দ্রবণ মিশিয়ে তৈরি করে প্রসাধনী। তারপর এগুলোকে বিদেশি প্রসাধনী বলে বিক্রি করছে।

ব্যবহারকারীরা জানেন না, ওই সব প্রসাধনীতে কি বিষাক্ত পদার্থ রয়েছে। ‘এক সপ্তাহে আপনাকে ফর্সা করবে’ মোড়কে এ ধরনের লেখা থাকলেও বাস্তবতা হচ্ছে রাতারাতি ত্বক ফর্সা করার কোনো নিরাপদ পদ্ধতি আজও আবিষ্কার হয়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও আন্তর্জাতিক চিকিত্সা বিজ্ঞান বিষয়ক জার্নালে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

খ্যাতিমান কিডনি বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক ও কিডনি ফাউন্ডেশন সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন অর রশীদ বলেন, ত্বক ফর্সা করার জন্য উত্পাদিত পণ্যে ক্ষতিকর মার্কারি মুখে কিংবা শরীরে ব্যবহার করার পর তা রক্তের সঙ্গে মিশে যায়। যা ধীরে ধীরে ক্রনিক কিডনি রোগ ডেকে আনে। সৃষ্টি করে ক্যান্সার।

চর্ম ও যৌন রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এম এন হুদা বলেন, ত্বক ফর্সা করার ক্রিমসহ যে কোনো প্রসাধনী ব্যবহারে চামড়ার রং নষ্ট হয়ে সাদা হয়। সাময়িক এই পরিবর্তনে ব্যবহারকারী মনে করেন তিনি ফর্সা হচ্ছেন। প্রসাধনীতে দেয়া বিষাক্ত দ্রব্য রক্তের সঙ্গে মিশে গিয়ে নানা ব্যাধি সৃষ্টি করে। চামড়ায় ক্যান্সার ছাড়াও নানা ধরনের জটিল রোগ তৈরি করে।

র্যাবের ভেজাল বিরোধী মোবাইল কোর্টের ম্যাজিস্ট্রেট এএইচএম আনোয়ার পাশা অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ ভেজাল ও নকল প্রসাধনী জব্দ করেছেন। জড়িতদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডও দেয়া হয়।

সর্বশেষ গত ৭ জুলাই পুরান ঢাকার মালিটোলা ১৫ নম্বর বাড়িতে আনোয়ার পাশা অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ নকল ও ভেজাল প্রসাধনী সামগ্রী এবং তৈরির যন্ত্রপাতি জব্দ করেন। মোবাইল কোর্ট ময়না হাজীর বাড়ি হিসাবে পরিচিত ওই বাড়িতে নকল ও ভেজাল শ্যাম্পু, বডি স্প্রে, চুলের তেল, বডি লোশন, ত্বক ফর্সা করার ক্রিমসহ বিভিন্ন প্রসাধনী সামগ্রী তৈরির ১৮টি কারখানার সন্ধান পান। বিষাক্ত প্রসাধনী সামগ্রী উত্পাদন ও বাজারজাত করার অভিযোগে মালিক আনোয়ার হাওলাদার ও ছানোয়ার হাওলাদারকে মোবাইল কোর্ট দুই বছরের কারাদণ্ড ও দুই লাখ টাকা করে জরিমানা করে। কারখানা সিলগালা করে দেয় মোবাইল কোর্ট।

ওখানে প্যান্টিন, ডাভ, হেড অ্যান্ড শোল্ডার, সানসিল্ক ও ক্লিয়ার ব্র্যান্ডের নকল শ্যাম্পু তৈরি হত। এছাড়া মেক্স, এক্স, হ্যাভক, ব্রুট ও ডয়েট ব্র্যান্ডের নকল বডি স্প্রে তৈরি করা হত ওই কারখানায়। আসল মোড়ক ও প্রায় হুবহু রঙ-সুগন্ধি ব্যবহারের কারণে ক্রেতাদের পক্ষে আসল-নকল বোঝাটা কঠিন হয়ে পড়ে।

কারখানার মালিক ও শ্রমিক মোবাইল কোর্টকে জানায়, ব্যবহূত বোতল ও কৌটা পরিষ্কার করে লেবেল ও হলোগ্রাম লাগিয়ে প্রথমে নতুনের মত করা হয়। পরে সিরিঞ্জের সাহায্যে নকল শ্যাম্পু বা লোশনের তরল ভিতরে ঢোকানো হয়। আসল ব্র্যান্ডের মত একই সুগন্ধি দেয়ায় ব্যবহারকারী আসল-নকলের পার্থক্য করতে পারেন না। সাধারণ দোকানে তো বটেই, অনেক বড় বড় শপিং মলেও এসব পণ্য বিক্রি হয় বলে তারা মোবাইল কোর্টকে জানায়।

তারা জানান, তরল সাবান, স্পিরিট, সুগন্ধি ও রাসায়নিক দ্রব্যের সংমিশ্রণে শ্যাম্পু, কন্ডিশনার, লোশন, সুগন্ধি ও বডি স্প্রে তৈরি করা হয়। পরে এগুলো হয়ে যায় নামি-দামি ব্র্যান্ডের প্রসাধনী। মার্কারি, হাইড্রোকুইনাইন ও হাইড্রোজেন পারঅক্সাইডের সংমিশ্রণে নকল, ভেজাল ও বিষাক্ত প্রসাধনী তৈরি করা হয়ে থাকে। উত্পাদিত এসব বিষাক্ত, নকল ও ভেজাল প্রসাধনী গ্রামাঞ্চলের হাট-বাজার ও উপজেলা শহরে সয়লাব। গ্রামের সহজ-সরল কিশোরী-তরুণীরা না বুঝে এগুলো বেশি ব্যবহার করছে। বিউটি পারলারেও এসব প্রসাধনীর ব্যবহার বেশি।

বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ও আন্তর্জাতিক চিকিত্সা বিজ্ঞান বিষয়ক জার্নালে বলা হয়েছে যে, রূপচর্চা করতে গিয়ে আসলে নারী কি মাখছেন তা তারা নিজেরাও জানেন না। রূপচর্চার জন্য মেডিক্যাল চিকিত্সা বিজ্ঞান মতে কোনো ওষুধ আবিষ্কার হয়নি। তাও নারীরা জানে না। তারপর নকল ভেজাল ও বিষাক্ত প্রসাধনী ব্যবহার জীবনে শুধু সর্বনাশা নারীরা ডেকে আনছে।

মার্কারি ত্বক থেকে রক্তে মিশে গিয়ে কিডনি নষ্ট করে ফেলে। গর্ভবতী মায়ের সন্তানের মস্তিষ্কের গঠন বাধাগ্রস্ত করে। পরে প্রতিবন্ধী সন্তান জন্ম হয়। দেশে প্রতিবন্ধী, হাবাগোবা শিশু আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ার জন্য বিষাক্ত প্রসাধনী ব্যবহারও অন্যতম দায়ী। এগুলো অসময়ে গর্ভপাত ঘটায়। বিষাক্ত প্রসাধনী ব্যবহারে স্নায়ুতন্ত্রের ক্রিয়া বিনষ্ট করে স্নায়বিক সমস্যার সৃষ্টি করে। চামড়ায় ক্যান্সার, চামড়া বিবর্ণ, রেশ সৃষ্টি ও যন্ত্রণাদায়ক চর্মরোগ সৃষ্টি করে। ব্যাকটেরিয়া ও ফাংগাসজনিত স্থায়ী রোগ সৃষ্টি করে থাকে। মস্তিষ্কে বিষক্রিয়া করে মানসিক বিকৃতি ঘটায়। পরিপাকতন্ত্রে বিষক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং লিভার দ্রুত নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। পরিবারের কোনো সদস্য উক্ত নকল, ভেজাল ও বিষাক্ত ক্রিম ব্যবহার করলে শিশুরা বাম্প বা স্পর্শ দ্বারা অনুরূপ মরণব্যাধি কিংবা জটিলতা আক্রান্ত হতে পারে বলে আন্তর্জাতিক জার্নালে উল্লেখ করা হয়।

সূত্রঃ http://www.somoyerkonthosor.com/news/100052

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here