পারফিউমের ইতিহাস এবং কিভাবে তা তৈরি করা হয়

0
6
পারফিউমের ইতিহাস
পারফিউমের ইতিহাস

পারফিউমের ইতিহাস এবং কিভাবে তা তৈরি করা হয়

পারফিউম এমন একটি জিনিস যা আবালবৃদ্ধবনিতা সকলেই আজকাল ব্যবহার করে। আমাদের প্রতিদিনের ব্যবহার্য্য জিনিসের মধ্যে অন্যতম একটি প্রসাধনী হচ্ছে পারফিউম। চলুন, পড়ে নেওয়া যাক, এই পারফিউমের ইতিহাস এবং কিভাবে তা তৈরি করা হয়।

ইতিহাসের প্রথমদিন থেকেই মানুষ প্রকৃতির বিভিন্ন গন্ধ অনুকরণ  করে নিজেদের ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন সুগন্ধি তৈরির চেষ্টা করে গেছেন। সেই আদিকাল থেকেই মানুষ প্রাকৃতিক এবং কৃত্তিম উপকরণ ব্যবহার করে ত্বক, পোশাক এবং প্রসাধনীর জন্য সুগন্ধি তৈরি করার চেষ্টা করে আসছে। তখন থেকেই মানুষ শরীরের বিভিন্ন রসায়নিক এবং শরীর থেকে নির্গত বিভিন্ন পদার্থের গন্ধের সাথে ওয়াকিবহাল ছিল তাই তারা শরীর থেকে নির্গত এই সব পদার্থের গন্ধ দূর করার জন্য বিভিন্ন সুগন্ধি সৃষ্টির চেষ্টা করে চলছে।

সুগন্ধি/perfume ল্যাটিন শব্দ “per” অর্থ “মাধ্যমে” এবং “fumum” অর্থ  “ধোঁয়া”। অনেক প্রাচীন পারফিউম গাছপালা থেকে প্রাকৃতিক তেল pressing এবং  steaming     মাধ্যমে আহরণ করে তৈরি করা হত। ওই তেল পোড়ানোর মাধ্যমে বাতাসে সুগন্ধি তৈরি করা হত। আজ অধিকাংশ সাবানে সুগন্ধি ব্যবহার করা হয়।

তরল সুগন্ধি যখন শরীরের জন্য ব্যবহারিত হয় তখন তা পারফিউম হিসাবে বিবেচিত হয়। তেলের মধ্যে কি পরিমান alcohol ব্যবহার করা হয় তার উপর ভিত্তি করে পারফিউমের যথার্ততা যাচাই করা হয়। সাথে পানিও ব্যবহার করা হয়। বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম সুগন্ধি বাজার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এর বার্ষিক বিক্রয় বিলিয়ন ডলার।

বাইবেল অনুসারে, তিন জ্ঞানী ব্যক্তি শিশু যীশুর গন্ধ-রস পরিদর্শন করে বহন করছে। প্রাচীন মিশরীয়রা ধর্মীয় অর্ঘ হিসাবে মেহেদি, গন্ধ-রস, দারুচিনি, kyphi -made নামক একধরণের গাছ  ধূপ জ্বালিয়ে প্রদান করত। তারা সুগন্ধি পানি এবং তেল কাঠ, আঠা ও রাসিন মিশিয়ে এক ধরনের সুগন্ধি লোশন তৈরি করে ব্যবহার করতো।  গোড়ার দিকে মিশরীয়রা দেবতার কাছে মৃত দেহ নির্দিষ্ট সৌরভের সুগন্ধি মাখিয়ে অর্পণ করতো। আর সেই সুগন্ধির নাম করন করা হয়েছিল “দেবতাদের সুবাস.”। মুসলমানদের নবী মোহাম্মদ লিখেছেন, পারফিউম এক ধরনের খাবারের মত, যার ব্যবহারে আত্ম বিশ্বাস চাঙ্গা হয়ে থাকে।

অবশেষে মিশরের সুগন্ধি দ্বারা গ্রীক ও রোমানরা প্রভাবিত হয়। শত শত বছর ধরে রোমের পতনের জন্য এই সুগন্ধি শিল্পকে দায়ী করা হয়। তেরশো শতাব্দীর দিকে যখন ক্রুসেডাররা ফিলিস্তিন থেকে নমুনা ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও ইতালিতে নিয়ে আসে তখন থেকে এই পতন সারা ইউরোপে ছড়িয়ে পরে। সতেরশো শতাব্দীর দিকে ইউরোপীয়রা সুবাসের মাধ্যমে রোগ নিরাময় পন্থা আবিষ্কার করে এবং প্লেগ ক্ষতিগ্রস্থদের চিকিৎসায় ডাক্তাররা চামড়ার প্যাকেটে কটুগন্ধ লবঙ্গ, দারুচিনি, মশলা ভরে ওদের নাকে এবং মুখে দেওয়া শুরু করে। ধারণা করা হতো এই পন্থা তাদের রোগ মুক্তি করবে।

এরপর রাজতন্ত্রে সুগন্ধির ব্যবহার ব্যাপকহারে বেড়ে গেল। ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুই, সুগন্দির প্রতি এই বেশী আসক্তি হয়ে পরেন যে পরবর্তীতে তার নাম হয়ে যায়  “সুগন্ধি রাজা”। তার আদালতে তিনি একটি পুষ্পশোভিত প্যাভিলিয়ন প্রতিষ্ঠা করেন এবং ঐখানে অনেক ধরনের শুকনো ফুল রাখেন যাতে প্রাসাদের মধ্যে সতেজ বাতাস সুগন্ধময় হয়। রাজকীয় অতিথিদের ছাগলের দুধ এবং গোলাপের পাপড়ি দিয়ে স্নান করানো হত। অতিথিদের ব্যবহৃত সব কিছু ব্যবহারের পুর্বে পোশাক, আসবাবপত্র, দেয়াল, এবং খাবার থালাবাসন সুগন্ধি দ্বারা স্প্রে করা হত।

এইদিকে ইংল্যান্ডে, lockets এ arometics অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আঠারোশো শতাব্দীর শেষের দিকে যখন সুগন্ধির মধ্যে রাসায়নিক এর ব্যবহার শুরু হয় তখন থেকে পারফিউম এর বাজারজাত শুরু হয়। প্রথম দিকে কৃত্রিম সুগন্ধি ছিল nitrobenzene যা নাইট্রিক অ্যাসিড এবং বেনজিন থেকে তৈরি হত। এই কৃত্রিম মিশ্রণ এক ধরনের বাদামের সুগন্ধে ভরপুর ছিল এবং তা সাবানের সুগন্ধি তৈরিতে ব্যবহৃত হত। ১৮৬৮ সালে ইংরেজ উইলিয়াম পারকিন দক্ষিণ আমেরিকান Tonka শিম থেকে coumarin সংশ্লেষণ এর মাধ্যমে এক ধরনের পারফিউম তৈরি করতো যার সুবাস অনেকক্ষণ পর্যন্ত বহমান ছিল। বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্দিনান্দ তিএমান কৃত্রিম বেগুনী এবং  ভ্যানিলা সুগন্ধ মিশ্রণ তৈরি করে। পরবর্তিতে বিভিন্ন মিশ্রণে লেবুর রসের ব্যবহার শুরু হয় এবং লেবুল ব্যবহারে এলকোহল এর ব্যবহার এর সুবিধা উদ্ঘাতিত হয় এবং এই এলকোহল এর সাথে বিভিন্ন ধরনের উপাদান মিশিয়ে বিভিন্ন ধরনের সুগন্ধ তৈরি হত যা অনেকক্ষণ পর্যন্ত স্থায়ী হত।

সুগন্ধ শিল্পের বিকাশ শুরু হয় বোতলজাত করে সুগন্ধ বাজারজাতকরনের মাধ্যমে। প্রাচীন মিশরে, কাচের বোতল উদ্ভাবিত হওয়ার পর, সুগন্ধি বোতল এর ক্রাফ্টিং সমগ্র ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে এবং আঠারোশো শতাব্দীর মধ্যে ভেনিস বোতল ক্রাফ্টিং শিল্পের শিখরে পৌঁছে যায়। আর আজ বোতলের সুবাসের চরিত্র বোতলের উপর আঁকা ডিজাইন দ্বারা প্রতিফলিত হয়।

বর্তমানে পারফিউম উৎপাদনে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে প্রাকৃতিক উপাদান – যেমন উপত্যকার লিলির মতো কিছু গাছ, তেলরং , ফুল, ঘাস, মশলা, ফল, কাঠ, শিকড়, রেসিন, balsams, পাতা, মাড়ি এবং সেই সাথে ব্যবহৃত হচ্ছে এলকোহল, পেট্রোকেমিক্যাল, কয়লা ইত্যাদি।

কিছু সুগন্ধি উপাদানে পশু পন্য ব্যবহৃত হয়, উদাহরণস্বরূপ – উদ্বিড়াল beavers – যাতে সুগন্ধি ধীরে ধীরে বাতাসে ছড়ায় এবং নির্গত সুগন্ধি সব সময় একই থাকে। মাঝে মাঝে জল পারফিউম উৎপাদনে এলকোহল ব্যবহৃত হয় যা আমরা বর্তমানে আমাদের কাছে পারফিউম নামে পরিচিত। এলকোহলের অনুপাতের উপরও নির্ভর করে সুগন্ধির স্থায়িত্ব।

উৎপাদন প্রক্রিয়া

উৎপাদন প্রক্রিয়া  শুরুর প্রথমে, উৎপাদনের প্রাথমিক উপাদানগুলো উৎপাদন কেন্দ্রে আনতে হয়। সঠিক সুবাসের জন্য সারা বিশ্ব থেকে উদ্ভিদের প্রয়োজনীয় পদার্থগুলো সযত্মে সংগ্রহ করা হয় আর প্রাণীর থেকে আহোরিত পন্য সরাসরি প্রাণীর চর্বিজাতীয় পদার্থ আহরণের দ্বারা প্রাপ্ত করা হয়। বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক পদার্থের মিশ্রণে অ্যারোমেটিক সিন্থেটিক পারফিউম গবেষণাগারে সুগন্ধি রসায়নবিদ দ্বারা তৈরি করা হয়।

আহরণ পদ্ধতি

ফুল এবং গাছ থেকে বিভিন্ন ধরণের তেল নিষ্কৃত হয়, যা পারফিউম তৈরির ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। গাছ থেকে তেল আহরন করে নিতে হয়। এটি করার জন্য বিভিন্ন ধরণের পদ্ধতি আছে। সবথেকে সহজ পদ্ধতি হচ্ছে গাছটিকে নিংড়ে তার থেকে তেল বের করে নেওয়া। Enfleurage এবং maceration হচ্ছে অন্য পদ্ধতি যার মাধ্যমেও তেল আহরন করা হয় গাছ থেকে। এই পদ্ধতিতে গ্রীজ অথবা গরম চর্বি ব্যবহার করে তেল আহরন করা হয়। গাছটিকে সিদ্ধ করেও তেল আহরন করা যায়। এই পদ্ধতিটিকে বলা হয় Steam Distillation. কিছু কিছু উৎপাদক Solvent Extraction পদ্ধতি ব্যবহার করে তেল আহরন করার জন্য। এই পদ্ধতিতে Benzene এবং Ethyl Alchohol মিশিয়ে গাছটিকে ভিজিয়ে রাখা হয়। পরবর্তীতে এটিকে পুড়িয়ে তেল আহরন করার হয়। যদি কখনো মনে করেন কেন পারফিউমের এত দাম, তাহলে জেনে রাখবেন, একটি ১৫ মিলি ফ্রেঞ্চ পারফিউমের বোতল তৈরিতে ৬৬০ টি গোলাপ ফুল লাগে শুধুমাত্র তেল আহরনের জন্য।

মান নিয়ন্ত্রণ

পারফিউম উৎপাদন অনেকবেশি ঝুঁকিপুর্ন কারন উদ্ভিদ পদার্থের যথাযথ ফলন এবং প্রানী পন্যের সহজলভ্যতার উপর পারফিউমের গুনাগুন ব্যাপকভাবে নির্ভর করে। এক পাউন্ড ফুলের তেলের জন্য হাজারো ফুলের প্রয়োজন হয় এবং যদি ফুল মৌসুমি ফসল রোগ এবং প্রতিকূল আবাহাওয়া দ্বারা আক্রান্ত হয় তাইলে সুগন্ধির যথাযথ গুনাগুন বাধাগ্রস্থ হয়। উপরন্ত প্রাকৃতিক তেলের যথাযথ গুনাগুন বজায় রাখা কঠিন হয়।

এই সমস্যা ছাড়াও প্রাকৃতিক পশু তেল সংগ্রহ করতেও নানান ঝামেলার সম্মুখীন হতে হয়। অনেক প্রানী হত্যা/শিকার করা ছাড়া ওদের থেকে থেকে প্রয়োজনীয় পদার্থ আহরন করা যায় না, আবার অনেক প্রানী হত্যা/শিকার করা  বে-আইনি। আবার অনেক প্রানী পন্য আহরন করতে হয় নানান দেশ থেকে, যেমনঃ তিব্বত ও চীন পাওয়া হরিণ থেকে আসতে হবে হরিণের কস্তুরী; সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে beavers; ইথিওপিয়া থেকে গন্ধগোকুল বিড়াল।

ভবিষ্যৎ

বর্তমানে পারফিউম তৈরি আগের থেকে অনেক বেশী সহজতর হয়েছে। বর্তমানে পারফিউমে প্রাকৃতিক তেলের বদলে কৃত্রিম রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা হয় এবং আগের থেকে অনেক কম ঘনত্তে বাজারজাত করা হচ্ছে এবং স্থায়িত্ব ও আগের থেকে বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে।

অ্যারোমাথেরাপি মত, বিভিন্ন গবেষণায় সুগন্ধির ব্যবহার অনেক বেড়েছে। শরীরের গন্ধ এবং সুগন্ধির গন্ধের সমন্বয়ে অন্যকে আকর্ষণ করার জন্য ব্যবহৃত হয়। মানুষ, অন্যান্য স্তন্যপায়ী মত মস্তিষ্কে pheromones এর release বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকৃষ্ট করতে উদ্বুদ্ধ করে। আর পারফিউমে pheromones প্রভাব ডুপ্লিকেট করে এমন পদার্থ ব্যবহার করা হচ্ছে যাতে মানুষের মধ্যে যৌন উত্তেজনার রিসেপ্টর উদ্দীপিত হয়। পারফিউমের মাধম্যে শরীরের খারাপ গন্ধ ধামাচাপা দিতে পারে, শারীরিক ও মানসিক মঙ্গল সেইসাথে তাদের যৌনজীবন উন্নতি করতে পারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here