মাটির দেহে নূরের প্রদীপ জ্বালো সায়েম

0
3
মাটির দেহে নূরের প্রদীপ জ্বালো সায়েম
মাটির দেহে নূরের প্রদীপ জ্বালো সায়েম

মাটির দেহে নূরের প্রদীপ জ্বালো সায়েম

মাটির দেহে নূরের প্রদীপ জ্বালো সায়েম একে একে দুটি সিয়াম পেরিয়ে আমরা তৃতীয় সিয়ামে পৌঁছেছি। সিয়াম কীভাবে মানুষের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে? কীভাবে মানুষের আল্লাহপ্রাপ্তি ঘটায়, তা-ই বলছি আজ।

দুটি বিপরীত শক্তির প্রচণ্ড সংঘর্ষ নিয়ে তৈরি মানবসত্তা। মানুষের মাঝে ফেরেশতার শক্তি যেমন আছে, আছে শয়তানি শক্তিও। ফেরেশতা চায় তাকে আল্লাহর কাছে নিয়ে যেতে, আর শয়তান চায় তাকে ওপর থেকে টেনে নিচে নামাতে। এত নিচে যে, পশুও যে স্তরে নামতে ভয় পায়।

শয়তানি যে শক্তি মানুষের মাঝে আছে তাকে বলে নফস। আর ফেরেশতাসত্তাকে বলে রুহ। যখন নফস শক্তিশালী হয়, তখন রুহ দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন আর তার কাছে, ভালো ও সুন্দর কিছু ভালো লাগে না। যত অসুন্দর, যত নোংরা সবকিছু তার

কাছে অমৃতের মতো মনে হয়। এ কথাই কোরআন এভাবে বলছে, ‘মানুষের ভেতর লুকিয়ে থাকা নফস যখন শক্তিশালী হয়, তখন পার্থিব জগৎ ও পাপকাজ তার চোখে সুন্দর ও আকর্ষণীয় মনে হয়।’

আমাদের ভেতর থাকা রুহ যখন শক্তিশালী হয়, তখন নফস দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন কোনো খারাপ কাজ মানুষের কাছে ভালো লাগে না। এ কথাও কোরআন বলছে, ‘পৃথিবীর চাকচিক্য তাদের আকর্ষণ করে না।’ তাহলে দেখা যাচ্ছে, সফলতার জন্য অবশ্যই একজন মানুষের ভেতরে থাকা রুহকে শক্তিশালী করতে হবে। তবেই তার নফস আস্তে আস্তে দুর্বল হয়ে আসবে।

এখন প্রশ্ন হল, রুহকে শক্তিশালী করতে হয় কীভাবে? উত্তর খুবই সহজ। নফসকে দুর্বল করলেই রুহ শক্তিশালী হয়ে উঠবে। সুফি দার্শনিক ইমাম গাজ্জালি (রহ.) বলেন, নফসের সম্পর্ক মাটির দেহের সঙ্গে। আর রুহের সম্পর্ক নূরানিসত্তা আল্লাহতায়ালার সঙ্গে। নফস চায় মাটির খাবার। মাটি থেকে উৎপন্ন খাবার খেলে নফস শক্তিশালী হয়ে ওঠে। একই খাবার খেলে আমাদের দেহও হয় পরিপুষ্ট। তখন আমাদের মনে কাম-ক্রোধ জেগে ওঠে।

রুহের সম্পর্ক নূরানিয়াতের সঙ্গে। সে চায় নূরের খাবার। নূরের খাবার হল ইবাদত-বন্দেগি ও মানবপ্রেম। তো কেউ যখন খানাপিনা করে এবং ইবাদতও চালিয়ে যায়, তখন একইসঙ্গে নফস ও রুহ তাদের খাবার পায়। দুটোই শক্তিশালী হতে থাকে। কিন্তু আমরা যদি নফসের খাবার বন্ধ করে, রুহের খাবার দিতে থাকি, তবে একইসঙ্গে আমাদের রুহ শক্তিশালী হবে এবং নফস দুর্বল হয়ে পড়বে।

ঠিক এ জন্যই আল্লাহতায়ালা সর্ব যুগে সিয়াম সাধনাকে বান্দার জন্য ফরজ করেছেন। সিয়াম সাধনার মাধ্যমে বান্দা নফসকে দুর্বল করবে। আর তারাবি, তাহাজ্জুদ, দান-সদকার মাধ্যমে রুহকে করবে শক্তিশালী।

এভাবে যখন একটি মাস নিয়মিত রুহ ও নফসের দ্বন্দ্বে রুহ বিজয় হতে থাকবে, নফস হয়ে পড়বে দুর্বল, তখন বান্দা তাকওয়ার একটি পর্যায়ে পৌঁছে যাবে। সিয়াম শেষ হয়ে গেলেও তাকওয়ার রেশ থেকে যাবে জীবনে। ওই তাকওয়ার শক্তিতেই সে নিজেকে মুক্ত রাখবে সব পাপ-অন্যায় থেকে।

আমরা যদি শুধু না খেয়ে থাকার সিয়াম করি, তবে আমাদের মাঝে তাকওয়া তো আসবেই না, বরং সিয়ামের প্রেমময় প্রভাবও আমরা উপলব্ধি করতে পারব না। তাই দেখা যায়, আমরা সিয়ামও করি, একইসঙ্গে পাপের জগতে নিজেদের হারিয়ে ফেলি। এর একমাত্র কারণ হল, আমাদের ভেতরে থাকা শয়তানি শক্তি ‘নফস’ বড় বেশি শক্তিশালী হয়ে পড়েছে।

আমাদের রুহ সেই নফসের সঙ্গে পেরে উঠছে না। এখন আমাদের একটি জিহাদে নামতে হবে। শপথ করতে হবে, যে করেই হোক আমাদের ভেতর জগতে থাকা নফসকে দুর্বল করে রুহকে শক্তিশালী করতে হবে।

জেনে রাখুন! সারা দিন না খেয়ে থাকা সহজ, লাখ টাকা খরচ করে হজ করেও আসা সহজ, নিয়মিত পাঁচ বেলা নামাজ পড়া আরও সহজ, জিহাদের ময়দানে গিয়ে জীবন দেয়া তারচেয়েও সহজ; কিন্তু নফস ও রুহের যুদ্ধে নফসকে পরাজিত করা যে বড় কঠিন। এটা একদিন বা এক মাসের কাজ নয়। জীবনজুড়ে এভাবে নফসের সঙ্গে যুদ্ধ করে যেতে হবে।

তার মানে দাঁড়াচ্ছে, একজন মুমিন পুরো জীবন নফসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেই কাটিয়ে দেবে। হাদিস শরিফে এ কাজটিকেই বলেছে- ‘জিহাদে আকবার’। আর এ কঠিন কাজটি সহজ করে দেয় রমজান। তাইতো রোজার বিধান দিয়ে আল্লাহ বলেছেন, ‘লাআল্লাকুম তাত্ত্বাকুন।

আশা করা যায়, নফস-রুহের যুদ্ধে, সিয়াম তোমাদের জয়ী করবে। তোমরা হয়ে উঠবে রুহজাগ্রত প্রেমিক মুত্তাকি সুফি মানুষ।’

লেখক : সাংবাদিক ও শিশুসাহিত্যিক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here